Analysis

কে এই মুকুল? কেন আজকের দিনে এত প্রাসঙ্গিক ?

মুকুল উত্থানের পেছনের রহস্য


মুকুল উত্থানের পেছনের রহস্য

মুকুল অল্পবয়স থেকেই খুবই করিদ কর্মা বললেন ছোটবেলায়  দেখা ৮৩ বছরের বৃদ্ধ ( নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) , পড়াশুনার সাথে নজর রাখতো ছোটোখাটো ব্যবসারদিকে , সাপ্লাই ও সার্ভিসে কোনো কিছুতেই না নেই মুকুলের। বিরোধীরা অনেক সময় বলেন যে  অবৈধ্য ওয়াগন ব্যবসাতেও যোগ ছিল, তবে কোনো পুলিশ ডায়রিতে নাম পাওয়া যায়নি।ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্যে উঠে আশায় মুকুল ক্রমাগত পরিণত হয়েছে।   অল্প বয়েসে জড়িয়েছে অনেক বিবাদে যেগুলো রাজনীতির সাথে কোনো যোগ না থাকলেও পরে যোগ করেছেন অনেকে। সরাসরি গুন্ডামিতে না থাকলেও প্রবল যোগাযোগ ছিল সত্তরের শেষে থেকে- মূলত কংগ্রেস ও নকশালদের সাথে ওঠা বসা ছিল , সর্বদা সিপিআই এম বিরোধী মনোভাব নিয়েই চলা মুকুল । মুকুল রায় যখন অল্প বয়স তখন এই বাংলাতে রক্তাত্ব রাতদিন, সেই সময় বিপদ পাস্ কাটিয়ে চললেও কেউ কেউ বলেন মদত ছিল অনেক কিছুতেই। যার ফলে মুলুক ক্রমশ পরিচিতির আলোতে আস্তে শুরু করে। অনেক কংগ্রেস নেতাদের আস্থা ভাজন ছিল , ওর বড় গুন্ সকলের সাথে যোগাযোগ রাখা , মিষ্ট ব্যবহার করা।অসম্ভব প্রতিশ্রুতি দিতে পারতেন মুকুল , অধিকাংশ ক্ষেত্রে কথা না রাখতে পারলেও যোগাযোগ রাখা মুকুলের স্বভাবের মধ্যে আছে। ।  বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা সর্বদা , কোন কিছুর আপাতত সহজে মেনে নিলেও তার মধ্যে অনেক কিছু খোঁজা থাকে মুকুলের কৌশল গত দিকে।

মুকুলের রাজনীতির মূল জায়গা তৈরী হলো মমতার অনুগামী হিসেবে রাজ্য রাজনীতিতে  যুব কংগ্রেসের মধ্যে দিয়ে। 

মুকুল রায় ১৯৯৮ সালে মমতা ব্যানার্জির সাথে সর্ব ভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস গঠনে সমান ভূমিকা পালন করেন। কলকাতা ও দিল্লির মধ্যে যোগাযোগ , এর সাথে জেলার নেতাদের মূল আস্থা ভাজন নেতৃত্ব হিসেবে উঠে আসা ও মমতা ব্যানার্জীর একদম কাছের মানুষ হিসেবে রাজ্যে পরিচিত।  ২০০৬ সালে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে আসেন।

মুকুল প্রথম নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেন ২০০১ এ , মমতা ব্যানার্জী প্রার্থী হিসেবে দাড় করালেন তার বিশ্বাস ভাজন মুকুলকে। প্রার্থী হলেন জগতদলে বিপক্ষে তখনকার রাজনীতিতে বাম সরিকদল সর্ব ভারতীয় ফরোয়ার্ড ব্লকের নেতা হারোপদ বিশ্বাস এর সামনা সামনি। হেরে গেলেন মুকুল , ভোট পেলেন মাত্র ৫৬৭৪১ টি। বুদ্ধদেবের নেতৃত্বে বাম সরকার ঘঠন হল। তবে হেরে গেলেও মমতার কাছে আরো ভরসা যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে অনেককে পিছনে ফেলে এগিয়ে গেলেন মুকুল – অজিত পাঞ্জা , পঙ্কজ ব্যানার্জী মদন মিত্র.

মমতার কাজের প্রতিদিনের ওঠা পরার সাথে মুকুল আস্তে আস্তে যুক্ত হলেন।  ২০০৬ এ রাজ্য সভার  সদস্য হিসেবে মনোনীত হলেন। সঙ্গে আরও বেশি গুরুত্ব পেলেন ,  কে কোথা থেকে দাঁড়াবে , কাকে দলে আন্তে হবে ও দিল্লিতে দলের গ্রহণ যোগ্যতা বাড়ানোর কাজ অনেকটাই ছিল মুকুলের হাতে।

ক্রমশ মমতার সাথে দিল্লির বিভিন্ন মিটিংয়ে যাওয়া আসার মাধ্যমে নিজের পরিচিতি গড়ে তুলতে ভুলে যাননি একদম।  কাজে লাগিয়েছেন নিজের বলয় তৈরী করতে , দলের ও নিজের ইমেজ বিল্ডিং করতে সব সময় এগিয়ে থাকতেন অনেক কে পিছনে ফেলে। ভোটের আগে বিভিন্ন দলের শীর্ষ্য নেতাদের যোগাযোগ থাকতো মুকুলের , এছাড়াও নির্বাচনের ফলাফল বেড়ালেই মুকুল রায় যেতেন দিল্লী আর চলতো বোঝা পড়ার কষাকুষি । সবে আসা দেড়েক ও ব্রায়েন  পাশাপাশি চললেও মুকুল কাছে ঘেঁষতে দিত না,  শুরু হল মুকুল রাজ্ তৃণমূলে।

UPA – ২ তে মুকুল  জাহাজ প্রতি মন্ত্রী হিসাবে যুক্ত হলেন তার পর রেল মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন মনমোহন সিং এর মন্ত্রী সভায় , এরই মাঝে অনেক বিতর্ক হয়েছে দলে ও সরকারে। অভিযোগ উঠেছে দুর্নীতির , জাহাজ দফতর নিয়ে ও রেলের স্ক্রাপ বিক্রি নিয়ে। 

২০১১ প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর নির্দেশে গুয়াহাটি – পুরি এক্সপ্রেস বেলাইন হয়ে দুর্ঘটনার ঘটার পর মূল দায়িত্বে ছিলেন মুকুল রায়।

২০১২ সালে ৱেল বাজেট বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন দীনেশ ত্রিবেদী মমতার সাথে , উঠে আসে মমতা – দীনেশ বিতর্ক , সরে যেতে হয় দীনেশ কে, শুরু হলো সর্ব ভারতীয় মুকুল যুগ  তৃণমূলে , রেলের ভাড়া বাড়িয়ে রেল পুনর্জীবন উদ্যোগ করার উদ্যোগ কে থামিয়ে রেল ভাড়া কমান মুকুল । ইতি মধ্যে অভিষেক ব্যানার্জীর উত্তান , দলের দখলে হাত- অভিষেকের , অভিষেকের পক্ষে অরূপ বিশ্বাস , ববি হাকিম সহ এক ঝাঁক নেতা যারা অভিষেক কে নিয়ে দলের মধ্যে কোঠারী তৈরি করলেও মুকুল কে বিপাকে ফেলা আর হলো না । এর পরই সারদা কান্ড ও মুকুলের নাম জড়িয়ে পড়া , প্রাক্তন মন্ত্রী সি পি আই এম নেতা গৌতম দেব, মুকুল রায় ও  মমতা ব্যানার্জী কে এক পাল্লায় তুলে জোর সওয়াল করেন। নাম জড়াতে শুরু করে মুকুল রায়ের।  ২০১৪ সালে সিবিআই এর তদন্ত শুরু আর মমতা মুকুলের দূরত্ব শুরু হল , দূরত্বের ব্যবধান আরও বেড়ে যায় ২০১৫ তে সিবিআইয়ের এর ডাক ও নারদের গোপন ছবি তে ঘুষ নেবার অভিযোগ। 

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মুকুল রায় ও মমতার সম্পর্কে মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে , দূরত্ব তৈরী হয় দলে ও বাইরে। যুক্ত থেকেও যুক্ত নয় গোছের ভাব , গোপনে শুরু হল নতুন দল তৈরীর পালা ,অমিতাভ মজুমদার সহ আরো অনেকে , যারা মুকুল পন্থী বলেই পরিচিত শেষের দশ বছর পরিচিত । ইতিমধ্যে উঠে গেল জেট ক্যাটাগরির নিরাপত্তা, বিতর্ক আরো অনেক বেশি , আনাচে কানাচে গুঞ্জন এই বোধহয় দল ভাঙছে মুকুল – নজর দাড়ি থেকে ফোনে আড়ি পাতার অভিযোগ উঠলো মমতার বিপক্ষে। মুকুল বিপক্ষে থাকা নেতারা এই সুযোগে মমতার আরো কাছে যাবার প্রতিযোগিতার শুরু করে দিলো।

মুকুল মমতা বাগযুদ্ধ, মুকুল কে বিজেপির কাছে নিয়ে যেতে আরো সাহায্য করলো।  মুকুল কৈলাশ বৈঠক নিয়ে জল্পনার শেষ রইলো না , নিদেন পক্ষে টিভিতে একঘন্টা আর খবরের কাগজে প্রথম পাতায়। শোনা যায় মুকুলের দল পরিবর্তনের আগে বাম ও কংগ্রেসের সাথে কথা হয়েছিল মুকুলের।  সব শেষে যোগ বিজেপিতে। তৃণমূল থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তে ছেড়ে বিজেপিতে যুক্ত হন আর ১১ নভেম্বর ২০১৭ তে  রাজ্য সভা থেকে পদত্যাগ করেন। 

প্রথমে দিলীপ-মুকুল বাক যুদ্ধ পরে দিল্লির মধ্যস্ততায় মিটে যায়।কুশলী মুকুল -দিলীপ ও সঙ্গে থাকা রাজ্য বিজেপি নেতারা অমিত মোদীর দেখানো পথে অনেকটাই এগোতে পেরেছে বলে রাজনৈতিক সমালোচকরা মনে করেন .

সোনা যায় বিজেপির সাথে বহু আগে থেকেই গাঁটছড়া বেঁধেছে মুকুল, ২০০৪ থেকে আর এস এসের সঙ্গে সম্পর্ক . তাই বিজেপির হাই রিচ বা উচ্চ যোগাযোগ ছিল মুকুলের। মমতার বার্তা বাহক হিসেবে মুকুল বিজেপি বা আর এস এসের সাথে দীর্ঘ কাল ছিল সম্পৰ্ক , তার ফলে অনেকের ধারণা সারদা বা নারদ এই সবের থামিয়ে দেবার ব্যাপারে মুকুল রায়ই মুখ্য ইঞ্জিনিয়ারিং টা করেছেন।
সারদার অনুমান- নারদ তে প্রমান, এথিক্স কমিটির নীরব থাকা , তদন্তের নামে হাক-ডাক হলেও থেমে থাকার জাদু কাঠি ছিল মুকুলের হাতেই। বস্তুত মমতার সাথে থাকা অনেকেই মুকুলকেই ভরসা করে এখন যারা নারদ বা সারদা তে জড়িয়ে আছেন । কলকাতা থেকে দিল্লি আবাদ যোগাযোগের মাধ্যমে অনেক কিছুই ঘটতে দেয়নি মুকুল , অনেকে বলেন রাজ্যের কিছু বাম নেতাও গোপনে যোগাযোগ রাখেন জল মাপার জন্য। কিছু মানুষ ভেবে ছিলেন তৃণমূল থেকে মুকুল চলে যাওয়া বোধ হয় মুকুলের রাজনৈতিক জীবন শেষ , কিন্তু সব অঙ্ক উল্টে দিতে চলেছেন মুকুল। গোপন রিপোর্ট অনুযায়ী মুকুলের গুরুত্ব ও ভরসাযোগ্য রাজনীতির লোক হিসেবে আছেন জনমানুষে , তার পড়ই বিজিপির মূল মানুষেরা তাকেই দায়িত্ব দেন বাংলায় নির্বাচনের । বিগত ২০১৭ থেকে বকলমে জাতীয়তাবাদী তৃণমূল কংগ্রেস গঠন ও চাপ সৃষ্টি করা তৃণমূলের ওপর, যাতে মুকুলের রাজনৈতিক জীবন গুরুত্ব না পায় । মুকুল পারে এই অবস্থান টা যাতে থাকে তার ব্যবস্থা টা খুবই সন্তর্পনে করে চলেছেন আজও , নানান দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও সেটা এখনো পর্যন্ত অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন । কেউ কেউ বলছেন বিজেপি নাকি মুকুলের মাধ্যমেই মমতাকে মনিটরিং করতো, তাই মুকুল বিজেপির ভরসা যোগ্য মুখ।

  সমগ্র সমীক্ষা টা ওপিনিয়ন টাইমস এর পক্ষ থেকে শেষের ১৫ দিনে তৈরী করা হল :

এই সমীক্ষা সামগ্রিক ভাবে কিছু দিক নির্দেশ করছে :

১) বিজেপি তৃণমূলের সম্মুখ লড়াই আসলে জাতীয় সমঝোতার লড়াই

২) আসন্ন নির্বাচনের ফল বিজেপি যদি একক না আসে, তাহলে এই রাজ্যে তৃণমূল ৩৫ থেকে ৩৮ টা আসন পাবে – মোদির সহযোগী অংশীদার হিসাবে বড় গোদি মমতা ব্যানার্জীর জন্য স্থান পাক্কা ,দিল্লির দরবারে তৃণমূল সমাদৃত হবে।

৩) তৃণমূলের বিরুদ্ধে কেন্দ্রসরকার ২০১৪ থেকে উপযুক্ত ব্যবস্থা যদি নিতো তাহলে ঘটে যাওয়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে  সিপিআই এম সুযোগ পাবে রাজনীতির মূল আসরে আশার , সেই পথ হিসেব করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে জাতীয় পর্যায়ের সমঝোতায়। 

৪) মুকুল রায় হয়তো তৃণমূলে ফিরবে না কিন্তু তৃণমূল কে রক্ষা করার পূর্ণ অবস্থানে থাকছেন ও সিপিআইএম কে আটকানোর জন্য।

৫) মমতা মুকুল দূরত্ব না হলে মমতা ব্যানার্জী বিপদে পড়বেন তাই মুকুল বিজেপিতে

৬) বিক্ষুব্দ তৃণমূল কর্মীরা যাতে সিপিআইএমে বা কংগ্রেসে না ফেরত যায় , বিজেপির দিকে যায় তার জন্য মুকুল বিজেপিতে .

৭) মমতা ব্যানার্জী অসামান্য  দক্ষতা রাখে  আগাম ধারণার ক্ষেতের যে ২০১৩ সালে  চিটফান্ড কাণ্ডের পর যে কোনো সময় বামেরা ফিরতে পারে রাজ্যে , তাই বিজেপি কে ম্যানেজ করা অত্যন্ত জরুরী. ভোটের বাক যুদ্ধ যাই হোক না কেন মমতা বড় নির্ভয়ে আছেন তাই তো অভিযুক্ত দের আবার ভোটে দাঁড় করিয়েছেন। 

৮) সারদা বা নারোদাতে অভিযুক্তদের টিকিট না দিলে অনেকে কংগ্রেস ও বিজেপির দিকে চলে যেতেন ওরা, তাই মুকুল বিজেপিতে থাকলে তৃণমূল নিশ্চিন্ত।

৯) মুকুল রায় মাওবাদীদের সাথে বহু মিটিং করেছেন যখন মমতার সাথে ছিলেন , তাই সম্প্রতি আর এস এস জঙ্গল মহলে মিটিং করে বিজেপি কে ভোট দেবার আবেদন জানিয়েছে।  আর এস  এস আস্তে আস্তে জঙ্গল মহলের অধিকারের জন্য চেষ্টা করেছে শেষের কয়েক মাস।

১০) বিজেপি  আগাম আন্দাজ করার জন্য মুকুলকে সযত্নে রেখেছিলেন আড়ালে আবডালে  , তেমনই মমতা ব্যানার্জী মুকুলের মাধ্যমে আন্দাজ করার চেষ্টা করছেন বিজেপির পদক্ষেপ।

১১) ইতিহাসে এর নিদর্শন আছে , যেমন শত্রু পক্ষের ঘরে নিজের আস্থা ভাজন লোককে ঢুকিয়ে দেওয়া ও তার দ্বারা বিপক্ষের পদক্ষেপ জানা , এই ক্ষেত্রে মুকুল মমতা উভয়ের যৌথ স্বার্থ। ব্যাতিক্রমী ,এক্ষেত্রে মুকুল রায় দুই পক্ষের কাজ একাই করছেন। বিপদ এখানে যে কোন সময় হিসেবে পাল্টে যেতে পারে যদি মুকুল মমতার যুদ্ধ তা সত্যিকরে হয়।

১২) মুকুল রায় তার নিপুন কৌশলে মমতার সমসমান অবস্থান তৈরী করে নিতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গে সকলের অজান্তে , যদি বিজেপি এই ২০১৯ নির্বাচনে ১০ এর বেশি সংখ্যা পান এই রাজ্যে তাহলে , সার্বিক ভাবে বাংলার রাজনীতির নতুন এক অবস্থান তৈরী হবে। 

Show More

Related Articles

Back to top button
Close
Close
%d bloggers like this: