Big Story

তৈরী করে রাখা মূর্তিগুলি ভেসে গেলো জলে, সাথে সকলের ঘুরে দাঁড়ানোর আশা

চরম বিপদের মুখে কুমোরটুলির শিল্পীরা

পল্লবী : ‘বলো দুগ্গা মাইকি জয়…’ মা দুর্গার আসার আগেই তার মূর্তি ভেসে গেলো জলে। হ্যাঁ আমপান-এর পর কুমোরটুলির ছবিটা ঠিক এরকমই ছিল। ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপে আসল বাজ যে পড়েছে কুমোরটুলি শিল্পীদের মাথায়। কারও ঘরের চাল উড়ে গিয়েছে। কারও বা প্রতিমা গড়ার জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক ক্ষতি হয়েছে প্রত্যেকজন শিল্পীরই। এমনিই এই বছরের দুর্গাপুজো নিয়ে চলছে জোর বিতর্ক। তার ওপর এই আমপান ! দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার জোগাড় হয়েছে প্রতিটি ঘরে ঘরে।

তবে আশা নিয়েই যে মানুষ বাঁচে। আর সেই আশা নিয়েই হাতে গোনা কয়েকটি দূর্গা মুক্তি গড়েছিলেন তারা। কিন্তু এই বিপর্যয় তা আর টিকিয়ে রাখলোনা। যে ক’টি দুর্গাপ্রতিমা শিল্পীরা তৈরি করছিলেন, তার বেশির ভাগই আমপানের দাপটে নষ্ট হয়ে গিয়েছে বলে জানাচ্ছেন তাঁরা। কুমোরটুলি মৃত্‍শিল্প সাংস্কৃতিক সমিতির সম্পাদক বাবু পাল বলেন, ”২০-২৫টি অন্নপূর্ণা ও শীতলা প্রতিমা এবং প্রায় ৩০-৪০টি লক্ষ্মী প্রতিমা বাইরে রাখা ছিল। সেগুলো সব ঝড়ে নষ্ট হয়েছে।” শিল্পীরা জানাচ্ছেন, ধীরে ধীরে সব কিছু খুলে যাচ্ছে দেখে জুন মাস থেকে তাঁরাও করোনার সব বিধি মেনে কাজ শুরু করার কথা ভেবেছিলেন। মৃত্‍শিল্পীরা স্থির করেছিলেন, লকডাউন উঠে গেলে জুন থেকেই কারিগরদের ডাকতে শুরু করবেন। কারণ, হাতে সময় অনেক কমে গিয়েছে। প্রতিমার বায়না পেলে কী ভাবে দ্রুত গতিতে কাজ করা যায় সে সবই পরিকল্পনা চলছিল। শিল্পীদের কথায়, ”মৃত্‍শিল্পের এমন সঙ্কট কোনও দিন এসেছে বলে শুনিনি। এই মন্দার মধ্যেও যেটুকু প্রতিমা তৈরি হয়েছিল সেগুলিও ঝড়ে নষ্ট হয়ে গেল।” সমিতির সম্পাদক কার্তিকবাবু বলেন, ”শিল্পীদের ভবিষ্যত্‍ অন্ধকারে। তার উপরে ছাদটুকুও কেড়ে নিল আমপান। শিল্পীদের স্টুডিয়োর মোট ক্ষতি কত, এখনও সেই পূর্ণাঙ্গ হিসেব আসেনি। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন, মৃত্‍শিল্পকে বাঁচাতে কুমোরটুলির শিল্পীদের পাশে দাঁড়ান।”

সমিতি সূত্রের খবর, লকডাউনের মধ্যে অন্নপূর্ণা, বাসন্তী ও শীতলাপুজো পড়ায় সে সব বাতিল করেছেন উদ্যোক্তারা। অন্নপূর্ণা প্রতিমার দাম পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা, শীতলা প্রতিমার দাম তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা এবং দেড় থেকে দু’হাজার টাকা মূল্যের লক্ষ্মী প্রতিমার মিলিয়ে লক্ষাধিক টাকার ঠাকুর নষ্ট হয়েছে। সব মিলিয়ে আর্থিক সঙ্কটের মুখে কুমোরটুলির প্রায় সাতশো শিল্পী। সরকারের সাহায্য ছাড়া ঘুরে দাঁড়ানো এ বার অসম্ভব, জানাচ্ছেন তাঁরাই। কুমোরটুলি মৃত্‍শিল্প সমিতির সম্পাদক কার্তিক পাল বলেন, ”প্রতি বৈশাখের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই ৮-১০টা বড় পুজোর বায়না পাই। এ বার একটাও পাইনি। লকডাউন ভাত আগেই কেড়ে নিয়েছে। ঘুরে দাঁড়ানোর যেটুকু বা চেষ্টা চলছিল, তা-ও আমপান শেষ করে দিল।” লকডাউনের জন্য চৈত্র, বৈশাখে শীতলা প্রতিমা কিনতে এ বার কুমোরটুলিতে কেউ আসেননি। পটুয়াপাড়ার শিল্পীদের প্রতি ঘরে সে সব পড়ে রয়েছে। এ বছর বিদেশ থেকে আসা দুর্গা প্রতিমার বায়নাও বাতিল হয়েছে। শিল্পী মিন্টু পাল বলেন, ”করোনার জন্য বিদেশ থেকে দশটি প্রতিমার বায়না আমার বাতিল হয়েছে। চরম সঙ্কটে পড়েছি। ঘূর্ণিঝড়ে আমার স্টুডিয়ো নষ্ট হয়েছে। দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করছিলাম। প্রবল বৃষ্টিতে গলে গিয়েছে।”

প্রতিটি উৎসবে যে মানুষগুলি ঈশ্বরের অপরূপ রূপ প্রদান করে তার সন্তানদের সামনে আজ চরম বিপদে তারাই। একের পর এক বিপদ খাড়া হচ্ছে তাদের সামনে। মাথা তোলার সময়টুকু পাচ্ছেননা তারা। ঈশ্বর কি রক্ষা করবেন না তাদের !

Show More

Related Articles

Back to top button
%d bloggers like this: