Analysis

শ্যামল চক্রবর্তীর কলমে : কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত স্মরণে

সিপিআইএমের প্রবীণ নেতা, প্রাত্তন মন্ত্রী ও রাজ্য সভার সদস্য এবং বর্তমানে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য স্মৃতি চারণ করলেন জনদরদী নেতা প্রমোদ দাস গুপ্তের

সিপিআইএমের প্রবীণ নেতা, প্রাত্তন মন্ত্রী ও রাজ্য সভার সদস্য এবং বর্তমানে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শ্যামল চক্রবর্তী

প্রমোদ দাসগুপ্ত স্বারক বক্তৃতা ২০১৯ : বিষয় সমসাময়িক ভারতে সাম্প্রদায়িকতাবাদ বিরোধী সংগ্রাম আমাদের কর্তব্য উপলক্ষে সিপিআইএমের সবভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি প্রধান বক্তা হিসেবে ছিলেন। আজকের সভায় উপস্থিত ছিলেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু , মোহাম্মদ সেলিম , সুজন চক্রবর্তী সহ অন্যান্য নেতৃত্ব। প্রমোদ দাসগুপ্ত সভাগৃহ কানায় কানায় পূর্ণ , তিল ধরণের জায়গা ছিল না। আর আজকের দিনটাকে সামনে রেখে প্রবীণ সিপিআইএম নেতা শ্যামল চক্রবর্তী স্মৃতিচারণা করলেন। প্রবীণ নেতার স্মৃতিতে ধরা দীর্ঘ আন্দোলনের টুকরো টুকরো ঘটনা যা অনেকেরই অজানা । এই লেখা টির কোন পরিবর্তন করা হল না।

চীনে চিকিৎসারত অবস্থায় প্রমোদ দা চলে যান। ওর সঙ্গী ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সাতদিন পর সকালে তার মরদেহ চীনের বিশেষ বিমানে দমদমে আসে। দমদম থেকে রাজ‍্যদপ্তর একটি খোলা ট্রাকে (তখন শব বাহী গাড়ি ব‍্যবহারের চল ছিল না।) রাজ‍্য দপ্তরে নিয়ে আসা হ য়। পথের দুপাশে দলনির্বিশেষে অগনিত মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানানর জন‍্য দাড়িয়ে ছিলেন।

রাজ‍্যদপ্তরে মরদেহ কয়েক ঘন্টা পার্টির সভ‍্য সমর্থক,দরদী ও সাধারণ মানুষকে শেষ শ্রদ্ধা জানানর সুযোগ দেওয়ার জন‍্য শায়িত ছিল। লাইন চলে গিয়েছিল মৌলালী পর্যন্ত‌। বিকেলে কেওড়াতলা শ্মশানের দিকে শোভাযাত্রায় অগনিত মানুষ অংশগ্রহণ তো করেছিলেন তো বটেই রাস্তাতে ও
অসংখ্য মানুষ অপেক্ষা করছিলেন। তারাও শোভাযাত্রায় অংশ নেন। কেওড়াতলা তো লোকে লোকারণ‍্য।
তখন ১৯৮২ সাল। কম‍রেড হরকিষান সিং সুরজিত সকাল থেকেই ছিলেন। তিনি বললেন পি ডি জি এম এল এ ,এম পি, মন্ত্রী কিছুই ছিলেন না। তার শেষ যাত্রায় এত মানুষ! সত‍্যিই তোমরা মাস পার্টি গড়ে তুলেছ‌।
সরোজ দা ঠিক করে দিয়েছিলেন পি ডি জির ট্রাকে থাকবে বিমান,বুদ্ধ, শ‍্যামল,সুভাষ,অনিল এই পাচজন। আর থাকবেন প্রবীণ কমরেড শান্তিময় ঘোষ।

শেষ জীবনটা প্রমোদ দা প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। একা থাকতেন।তাই অসুখের সময় আম‍রা পালা করে থাকতাম।দিনে রাতে। মাঝে মাঝেই দীঘা যেতেন কমরেড অনুরূপ পান্ডার তত্বাবধানে। একবার ঝাড়গ্রামেও গিয়েছিলেন জঙ্গলের মধ‍্যে কমরেড সাধন গুপ্তের বাড়িতে ছিলেন। ঐ সময় আমিও টি বি আক্রান্ত হ ওয়ায় স্ত্রী ও শিশু কন‍্যা ঊষসীকে নিয়ে ঝাড়গ্রামে একজন অধ্যাপকের বাড়িতে ছিলাম। মাঝে মাঝে দেখাও হত। প্রায়ই ঊসষীর জন‍্য শুকনো খাবার পাঠাতেন।।
দুপুর বেলা খেতেন এখন কার ছাত্র যুব অফিসের নীচে যেখা

নে লাইব্রেরী আছে ওখানে বসন্ত কেবিন নামে একটা রেষ্টুরেন্ট ছিল ওখানে দুপুরে খেতে আসতেন।পরে নকসাল উপদ্রব বাড়লে উনি গণশক্তি প্রিন্টার্সে খেতেন। বসন্ত কেবিনের মালিক ,তার নাম ছিল বসন্ত‌। দোকান প্রায় লাটে তুলে দিয়ে সব সময় প্রমোদার সঙ্গে থাকতেন। আমরা ঠাট্টা করে বলতাম বসন্ত জাগ্রত দ্বারে। অকৃতদার ব‍্যক্তি। নিজের কোনও স্বার্থ ছিল না।

আমার স্ত্রীর যখন অকস্মাৎ অপারেশন টেবিলে মৃত‍্য হয় তখন উনি কিম্বার নার্সিং হোমে ।চোখের অপারেশনের পর অপারেশনোত্তর পরিচর্যা চলছিল। তখন পুরণো পদ্ধতিতে অপারেশন হত। উনি আমাকে দেখা করতে বললেন‌। আমি যাওয়ার পর আমার হাত ধরে কে৺দে ফেললেন। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছিল। সঙ্গে সঙ্গে বসন্তদা আমার হাত ধরে বাইরে নিয়ে এলেন। নার্সিং হোমের মালিক ছিলেন ডাক্তার নারায়ন বসু।তিনি কোনও টাকা আমাদের কাছ থেকে নিতেন না।
তিনি ঐ নার্সিং হোম পি আর সিকে দান করে গেছেন। ডা বসু আমাকে বললেন ওনার চোখ দিয়ে জল পড়া খুব খারাপ হবে। খুব ইমোসানাল হয়ে পড়েছেন। পাষাণ ও যে গলে জল হতে পারে সেই প্রথম দেখলাম। পরে সুস্থ হবার পর আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন অনেক কথা।কি করে চলবে। কোথায় থাকব। কি ভাবে চলবে, ।সব কিছু। পরে আস্বস্ত করলেন তোমার মেয়ের দায়িত্ব আমাদের। তুমি কোনও চিন্তা কোরোনা। আমি থাকতাম আমার ভা ই এর পরিবারের সঙ্গে।

প‍্রমোদদা পার্টির সম্পাদক ছিলেন ১৯৬১ থেকে আমৃত্যু ১৯৮২ সাল পর্যন্ত। একদিকে পুরোণো পার্টিকে ভেঙেছেন অপর দিকে নতুন পার্টি গড়ে তুলেছেন। কমরেড হরেকৃষ্ণ কোনারের ভাষায় একটা ফর্ম ভাঙ্গছি আর একটা ফর্ম গড়ে তোলার জন‍্য। অনেক বাক ও মোড় পেরিয়ে, অনেক রক্তাক্ত পথ অতিক্রম ক‍রে গড়ে তুলেছেন বিশাল পার্টি। পি ডি জি, হরেকৃষ্ণ কোনার, জ‍্যোতি বসু এ তিনের কম্বিনেশন বিশাল জনসমর্থন নিয়ে কমিউনিষ্ট পার্টি তৈরী হলো। প্রতিটি জেলার প্রতিটি এল সি এমকে তিনি নামে ও মুখে চিনতেন।

পলিট ব‍্যুরোর সদস‍্য হিসাবে একসময় ত্রিপুরা, আসাম, বিহার, উড়িষ্যার দায়িত্বে ছিলেন । ঐ রাজ‍্যগুলিতে তরুণ নেতাদে সামনে নিয়ে এসেছিলেন।।ত্রিপুরায় মানিক।সরকার, আসামে উদ্ধব বর্মন, হেমেন দাস, উড়িষ‍্যায় জনার্দন পতি। পশ্চিম বঙ্গেও বিভিন্ন জেলায় নতুন নেতৃত্ব তৈরী করায় তার অবদান অপরিসীম।
একটা ছোট পার্টিকে হাতে কলমে বিশাল পার্টিতে পরিণত করেছিলেন। তিন ধরণের লড়াই তাকেলড়তে হয়েছিল। জ‍্যোতি বাবু ও হরেকৃষ্ণ কোনার কে নিয়ে সোভিয়েত পুষ্ট সংশোধনবাদ আর চীনের পার্টির মদতে নকসাল পন্থী দের বিরুদ্ধে আবার কংগ্রেস সরকারের আধা ফ‍্যাসিবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে। অবশ্য ১৯৭৩ এ হরেকৃষ্ণদা মাত্র ৫৯ বছর বয়সে ক‍্যান্সারে মারা যান। ৭০ দশকের আধা ফ‍্যসিবাদী আক্রমণ পি ডি জি ও জে বি এই মূলত এই দুজনের নেতৃত্বে মোকাবেলা করা হয়। জনতা পার্টির সঙ্গে যুক্ত আন্দোলন ও পরিশেষে আসন সমঝোতার মধ‍্য দিয়ে দেশে একটি নতুন সরকার এবং রাজ‍্যে বাম ফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়।
শুধু আমাদের রাজ‍্যে নয় ত্রিপুরা, কেরালাতেও বাম সরকার গঠিত হয়।

এহেন প্রমোদ দাশগুপ্তেকে সেই সত্তর দশকে অনেক অবাঞ্ছিত সমালোচনা, ও আক্রমণের সম্মুখীন হতে হয়। অপদার্থ,পার্টির সর্বনাশ করেছে। গ্রুপবাজ, স্তাবক প্রিয়, মার্কসবাদের অ আ ক খ বোঝেন না। ভীরু– এলাকা ছেড়ে চলে আসতে বলেছেন। ইত্যাদি ইত্যাদি।

প্রমোদ বলেছিলেন কয়েকটি এলাকা ছেড়ে আসতে বলেছি এই কারণে যে তা না হলে সশস্ত্র রাষ্ট্র শক্তির বিরুদ্ধে অনেক কমরেডকে আমারা হারাতাম। এজন‍্য বোঝা দরকার কখন এগোতে হয় কখন organised retreat করতে হয়। পুরণো দিনের রাজপুতদের মত করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে কমিউনিষ্ট দের নীতি নয়।এই সমালোচকরা বলতেন পার্টি নির্বাচন সর্বস্ব হয়ে গেছে। বিপ্লবী পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। এদের পালের গোদা‌ প্রমোদ দাশগুপ্ত।

এই বিপ্লবীদের মধ‍্যে একজন হলেন শ্রীযুক্ত পাচু রায়। আজকালের চিঠিপত্র কলমে বিপ্লবের ফুলকি ছোটাতেন। এখন তিনি মাথার পিছনে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী মমতা ব‍্যানার্জীর ছবি রেখে বসেন দক্ষিণ দমদম পৌরসভার চেয়ারম‍্যান।
———-আর সময় নেই জরুরি সভায় বসতে হবে।
কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত স্মরণে

লাল সেলাম।( লেখাটি শ্যামল চক্রবর্তীর ফেসবুক থেকে ) আজকের সভায় সীতারাম ইয়েচুরির বক্তব্য শুনুন।

Show More

OpinionTimes

Bangla news online portal.

Related Articles

Back to top button
%d bloggers like this: