Entertainment

সত্যজিৎ রায়ের জন্মবার্ষিকী আজ, শতবর্ষের আলোকে মহারাজাকে ফিরে দেখা

ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, শিল্প নির্দেশক, সঙ্গীত পরিচালক এবং লেখক সত্যজিৎ রায়ের জন্মবার্ষিকী আজ

প্রেরনা দত্তঃ যে সমস্ত বাঙালিকে নিয়ে আমাদের গর্ব চিরকালীন, তাঁদেরই একজন সত্যজিত রায়। তাঁর তৈরি ২৮টি সিনেমার অধিকাংশই একেকটি হীরক খণ্ড যেন। বিষয় বৈচিত্র্য থেকে সিনেমার প্রয়োগশৈলীর ব্যবহারে তিনি দিশারির ভূমিকা পালন করেছেন। ‘পথের পাঁচালী’ যদি হয় গ্রামীণ বাংলার রূঢ় বাস্তব ছবি, তাহলে ‘মহানগর’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘জন অরণ্য’ও ‘সীমাবদ্ধ’ তৎকালীন নাগরিক জীবনের দলিল- এটা মানতেই হবে।

তিনি কলকাতা শহরে সাহিত্য ও শিল্প সমাজে খ্যাতনামা রায় পরিবারে, ১৯২১ সালের ২ মে জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্বপুরুষের ভিটা ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কিশোরগঞ্জে (বর্তমানে বাংলাদেশ) কটিয়াদী উপজেলার মসুয়া গ্রামে। তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। সত্যজিৎ রায় প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতি পড়েছিলেন নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে। পড়তে চেয়েছিলেন ইংরেজি সাহিত্য, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিষয় নির্বাচন করতে হয়েছিল পিতৃবন্ধু প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের পরামর্শে। নিজে বার বার বলেছেন, অর্থনীতির ডিগ্রিটা তাঁর কোনও কাজেই আসেনি।যুবক বয়সে তাঁর আগ্রহ ছিল ছবি আঁকায়৷ শুরু করেন কমার্শিয়াল আর্টিস্টের কাজ৷

সত্যজিতের কর্মজীবন একজন বাণিজ্যিক চিত্রকর হিসেবে শুরু হলেও প্রথমে কলকাতায় ফরাসি চলচ্চিত্র নির্মাতা জঁ রনোয়ারের সাথে সাক্ষাৎ ও পরে লন্ডন শহরে সফররত অবস্থায় ইতালীয় নব্য বাস্তবতাবাদী চলচ্চিত্র লাদ্রি দি বিচিক্লেত্তে (ইতালীয়: Ladri di biciclette, বাইসাইকেল চোর) দেখার পর তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্বুদ্ধ হন।পৃথিবীর প্রায় সব আন্তর্জাতিক ফিল্মৎসব থেকে পুরস্কার এনেছে সত্যজিতের ছবিই। ভারতীয় আর কোনও পরিচালকের মুকুটে সেই রঙিন পালক নেই। তার চেয়েও বড় কথা, সত্যজিতের ছবিই প্রথম ভারতীয় জীবনের রূঢ় বাস্তব তুলে ধরে।

এখনও এই ছবিগুলো রীতিমতো প্রাসঙ্গিক। পাশেই রাখা যায় তাঁর শেষ পর্বের তিনটি ছবি- ‘গণশত্রু’, ‘শাখা প্রশাখা’ এবং ‘আগন্তুক’কে। বিষয় শহরকেন্দ্রিক হলেও, এই ছবিগুলোই তিনি গভীর জীবন দর্শনের কথাও শুনিয়েছেন, স্পষ্ট ভাষায়। সিনেমার প্রায়োগশৈলীতে হয়তো তেমন জোর ছিল না, কিন্তু বক্তব্যের আন্তর্জাতিকতায় ও জীবন দর্শনের বীক্ষণে ছবিগুলো একেকটি অধ্যায়ের মতো। আবার তিনি যখন ছোটোদের জন্য ছবি বানিয়েছেন (গুগাবাবা, হীরক রাজার দেশে, সোনার কেল্লা), সেখানেও ছোটোদের মন জয় করার উপকরণের পাশাপাশি বড়দের চিন্তার খোরাক ও রেখে দিচ্ছেন গল্পের নিচের স্তরে। সেটা উপলব্ধি করতে পারলে দর্শকের বাড়তি পাওনা। যে কারণে ‘গুগবাবা’ ও ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবি দু’টোর আবেদন এখনও সমকালীন।

পথের পাঁচালি সিনেমা তৈরির সময় সত্যজিত্ যখন আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন, তখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন কিশোর কুমারও। তিনি পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। কিশোর কুমারের প্রথম স্ত্রী রুমা গুহ ঠাকুরতার পরিবার সত্যজিতের দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিল। পরবর্তী কালে সত্যজিত্ যখনই ওই অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, ততবারই তা নিতে অস্বীকার করেছিলেন কিশোর কুমার। আসলে এভাবেই বোধহয়, এই অসাধারণ সিনেমার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক যুক্ত করে রাখতে চেয়েছিলেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পী।

পরিচালক হিসেবে সিনে জগতের গতিধারায় ভিন্ন ইতিহাস তৈরি করেছিলেন সত্যজিত্। মৃত্যুর আগেও অস্কারের ইতিহাসেও বদল ঘটে সত্যজিত্ রায়ের জন্যই। অসুস্থতার জন্য পুরস্কার নিতে যেতে পারেননি তিনি। তাঁকে অস্কার দিতে অস্কার কমিটিই এসেছিল কলকাতায়।

Show More

Related Articles

Back to top button
%d bloggers like this: