Big Story

করোনা আবহে রাম মন্দিরের শিলান্যাস, কী বলছেন জনসাধারণ ?

পরিস্থিতির সাথে ধুঁকছে দেশ, তার মধ্যেই ঐতিহাসিক ভূমিপূজা

দেবশ্রী কয়াল : ১৫২৭ সাল থেকে হয়ে আসা সংগ্রামের সমাপ্তি ঘটেছে। নির্মাণ হচ্ছে অযোধ্যা রাম মন্দির। আজকেই হল তার ভূমিপূজা। কিন্তু প্রশ্ন হল, করোনা যখন নিজের বিস্তার আরও প্রকট ভাবে করে চলেছে, প্রতিদিন ৫০ এর অধিক মানুষ দেশে করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন সেই সময় কী আদেও এই পূজা যথোপযুক্ত ? যখন বারবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন কোনো ধর্মীয় জমায়েত না এখন তখন কীভাবে এই পূজা সেই নিয়ে কিন্তু বিবাদ লেগেই রয়েছে। আর এই নিয়েই আমরা জানতে বের হয় জনসাধারণের কাছে। কী বলছেন তাঁরা ? কেমন ভাবে দেখছেন তাঁরা আজকের এই ভূমি পূজা ?

এই বিষয়ে জানতে আমরা প্রথমেই চলে যাই সোনারপুরের বাসিন্দা শুভ্র ভদ্রের কাছে। তিনি বলেন, ” আমি ইতিহাস তেমন বুঝি না, তবে যেদিন রায় বের হওয়ার কথা ছিল জানতাম তা মন্দিরের পক্ষেই আসবে, আর একবারও তা অন্যায় বলে মনে হয়নি। আর ভারত মূলত হিন্দুপ্রধান একটি দেশ, সেক্ষেত্রে আদালতের রায়ও বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং যথোপযুক্ত মনে হয়েছিল। আমি এই মন্দিরকে একটি স্থাপত্য হিসাবে দেখছি। তবে আমি কোনো ভগবানের বা কারোরই ভক্ত নই। তবে মাইথোলজি বিষয়টি খুব আকৃষ্ট করে আমাকে। শ্রী রামকে যদি বিচার করতে যাই, যদিও বিচার করার আমি কেউ না তাও বলবো যতটা জেনেছি বা বুঝেছি তিনি মানুষটা বেশ ভালো। কেবল তাঁর নিজের স্ত্রীকে আগুনে হাঁটতে বলা ছাড়া। এই মন্দির অবশ্যই হোক কিন্তু কখনও চাইব না তা নিয়ে সেখানে কোনো বিধি নিষেধ জারি হোক। সবার যেন সেখানে প্রবেশের অনুমতি থাকে। ” টাকার প্রসঙ্গ তুললে তিনি বলেন, ” এখানে যেন কোনো পান্ডা বা টাকার খেলাটা না হয়। ওই ঠিক যেমন তারাপীঠে হয় যেমন, টাকা দিলে আগে দর্শন এর সুবিধা। তাই এখানে যেন টাকার খেলা না হয় সেটাই চাইব। হ্যাঁ জানি এখন দেশের যা পরিস্থিতি তা অন্য ক্ষেত্রে টাকা ব্যয় করা উচিত। কিন্তু যদি আমরা একটু তলিয়ে ভাবি তাহলে কিন্তু দেখবো ভারত এমন একটি দেশ যেখানে কিছু করতে যাবো তখন মনে হয় টাকাটা অন্য কোথাও দিলে হয়ত ভালো হতো। তাই সেইভাবে কিন্তু কোনো সঠিক সময় না। ভালোই হয়েছে এখন হয়ে গেছে। রামের ভিত্তি সৃষ্টির হোক, ধ্বংসের নয়। “

এরপরেই আমরা যাই শিক্ষার্থী সব্যসাচী বিশ্বাসের কাছে, তাঁর মতে, ” রাম মন্দির নিয়ে মানুষের নিজস্ব একটি বিশ্বাস রয়েছে, তাঁর একটা গুরুত্ব রয়েছে, ঠিক আছে। আমি সেটাকে সম্মান জানাই। কিন্তু আজ দেশের এই কঠিন পরিস্থিতিতে সারা দেশ যখন বেশি করে আরও চিকিৎসা সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন, তখন কী সরকার কয়েকটা হসপিটাল তৈরির কথা ভাবতে পারে না ? এই মুহূর্তে আক্রান্তের নিরিখে সারা বিশ্বে আমরা তৃতীয় স্থানে রয়েছি, প্রত্যেকদিন দেশে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন। আর কিন্তু বেশি বাকি নেই যখন আমরা ২০ লক্ষের গন্ডিটাকেও ছাড়িয়ে ফেলব। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের পুরো মনোযোগ তো এখন একদম অন্যদিকে। যদি একদিকে মন্দির তৈরী হতে পারে তাহলে তার পাশাপাশি মানুষের স্বার্থে মানুষের জন্যে কেন হসপিটাল তৈরী হতে পারে না ? “

বেহালার দেবাংশু চক্রবর্তীকে যখন বর্তমান পরিস্থিতিতে রাম মন্দিরের এই সময়েই ভূমি পূজা যথাযথ জিজ্ঞাসা করা হয় তখন তিনি বলেন, ” মন্দির নিয়ে আমার কোনো রকম অসুবিধা নেই। বর্তমানে কোভিড পরিস্থিতিতে মানুষের অবস্থা বেশ খারাপ। সময়টা খানিক পিছালেই বোধ হয় ভালো হাত। তবে সব থেকে যে বিষয়টা আমার খারাপ লাগছে তা হল এই নোংরা রাজনীতি। আমি হয়ত তেমন ভগবান মানি না কিন্তু শ্রী রাম সকলের কাছে পরম পূজ্যনীয় এবং শ্রদ্ধার। তাঁকে নিয়ে এখন যে রাজনীতিতে হচ্ছে তা মোটেও মানা যায় না। এই জিনিসটা করোনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে হলে হয়ত বেশি ভালো হাত। তাহলে এত বিবাদের সৃষ্টি হত না। আজ আমাদের বাংলায় সম্পূর্ণ লকডাউন। সেখানে আজকের দিনে কেন লকডাউন সেই নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। অনেকেই বুঝতে পারছে না, লকডাউন এর প্রয়োজন মানুষের জন্যই। যে হরে করোনা বেড়ে চলেছে তাতে লাগাম টানা আবশ্যিক। আজ হয়ত লকডাউন না হলে অনেকেই রাস্তার মধ্যে বেরিয়ে যেত নানান কিছু প্রচারে, যা আরও বেশি বিপদ। আবারও বলব মন্দির নিয়ে সমস্যা না, তাকে ঘিরে হয় রাজনীতিকে নিয়েই আমার সমস্যা। ”

বেহালা, ডায়মন্ড পার্কের শ্রীলেখা ব্যানার্জীকে এই নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ” আমরা সবাই জানি যে এখন কি পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে সবাইকে। একদিকে করোনা, অন্যদিকে অনাহার, বেকারত্ব অর্থনৈতিক ধস আরো কত কি। এই পরিস্থিতির মাঝে রাম মন্দির ভিত্তি স্থাপন নেহাত হঠকারী পলিটিক্যাল স্টান্ট ছাড়া আর কিছু না। এল কে আদবানির সময় থেকে বিজেপি চিরকালই হিন্দুধর্মে সুর টেনে ভোটারদের একদলের করেছেন। আর বর্তমানে হিন্দু রাষ্ট্র তৈরি করার প্রকল্প। যখনই মেডিকেল স্টাফেরা কোনো সাহায্য চেয়েছেন, মোদীজি চুপ থেকেছেন। বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় যে উত্তালতা দেখা গেছিলো মানুষের মধ্যে আজ তা হাজার গুনে বেড়ে গেছে। কিছুদিন আগে এক পুরোহিত ও ষোলোজন পুলিশ অফিসার করোনা তে আক্রান্ত হলেন। তারপর ও শুধু জেদ ও রাজনীতি বজায় রাখতে এতবড় সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। আজকের পরে যে আক্রান্তদের সংখ্যা কতটা বাড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ যে হিন্দু দের জন্য উনি এই কাজ করছেন তাদের অন্তর্গত দলিতরা আজ জায়গা পাচ্ছেন না ঐ মন্দিরে। মানুষের বেঁচে থাকা টা আজ গৌণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ”

এরপর যখন আমরা সরাসরি চলে যাই যাদবপুরের সৃজনী দত্তের কাছে যিনি একজন সাহিত্যের ছাত্রী। তিনি বলেন, ” আমার কাছে র্যাম রাজত্ব বলে আসলেই কিন্তু কিছুই হয় না। হটাৎ কোনো এক রাজনৈতিক দল, কোনো এক পক্ষের একদল লোকের একটি বিশ্বাসকে নিয়ে হুড়োহুড়ি করার বা মাতামাতি করার পক্ষপাতী আমি নই। প্রত্যেক মানুষের ঈশ্বর আলাদা, তাঁদের ইষ্টদেবতা বা মতামত প্রত্যেকের আলাদা। সেক্ষেত্রে কেবল রামরাজত্ব বলে কিছু হয় তাতে কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাসী নই। অন্যান্য ধর্ম জাতির মানুষরা যে এর জেরে গৌণ হচ্ছেন না সেই বিষয়ে কী আমরা কোনোভাবে জোর দিয়ে বলতে পারি ? এখানে তো রামের ঘাড়ে বন্দুক রেখে একপ্রকার রাজনৈতিক খেলা চলছে এখানে। আর করোনার মতো কঠিন পরিস্থিতিতে কিন্তু রাম নাম করে করোনাকে কখনো রোধ করা যাবে না, আর অপেক্ষাতীত ভ্যাকসিনও একেবারে হাতের মুঠোয় চলে আসবে না। এছাড়া বারবার করে কিন্তু বলা হচ্ছে সোশ্যাল ডিস্ট্যানসিং এবং মাস্ক পড়ার কথা, সেখানে এই ভূমিপূজায় কতটা মেনে চলা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে, কারন টিভিতে অনেককেই কিন্তু মাস্ক ছাড়াই দেখতে পাওয়া গেছে। আর দেশের এমন অর্থনৈতিক সঙ্কটের দিন এই বিপুল টাকা গুলি যদি মানুষের প্রয়োজনে নানান দরকারি খাতে ব্যবহার করা যায় তাহলে বোধ হয় বেশি ভালো হয়। ”

তিনি আরও বলেন, ” আজ অনেক মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন, কারোর অর্থনৈতিক অবস্থা আরও দুরাবস্থা হয়ে যাচ্ছে। আজ একটু আগে দেখলাম উত্তর দিনাজপুরে এই পূজা নিয়ে রীতিমত উৎসব হচ্ছে, যেখানে আজকে সারা রাজ্যে লকডাউন পালনের কথা। সেই অবস্থাতে এইগুলি কী আদেও যথাযথ ? অন্যদিনতো পুলিশের বেশ ধরপাকড় দেখি, কি আজ তা সেবা সব কোথায় ? বেশ কিছু অবশ্যই হচ্ছে মিথ্যে বলবো না তবে তেমন তৎপরতার সাথে কিন্তু তা হতে দেখা যাচ্ছে না। এদিকে দিলীপ ঘোষ আবার বলছেন, এই কাজে কেউ বাঁধা দিতে আসলেই তার নিশ্চই কোনো উদ্দেশ্য আছে। ওনার এই যুক্তিহীন মন্তব্যে, মানুষকেই ভুলভাল জিনিসে আমোল দেওয়া বিষয়ে সত্যিই আর কিছু বলার থাকে না। কোথাও গিয়ে কিন্তু মনে হচ্ছে এই মন্দিরের শিলান্যাস কিন্তু একটা তুরুপের তাস যাকে বলে ভোট যুদ্ধে জয়ী হওয়ার একটা ফন্দি। এই চরম বিপর্যয়ের দিনে এই ভূমিপূজার আয়োজন কিন্তু এখন না করে কিছু দিন পরে করাই যেত। এই পরিস্থিতিতে শিলান্যাস করে তো আর সবকিছু ঠিক হবে না, বা করোনা পালিয়ে যাবে তা তো না। আজ মোদীজি বলছেন রাম মদিরের পর নাকি দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটবে, এদিকে এত বছর ধরে যখন দেশের অর্থনৈতিক কোনো পরিবর্তন ঘটলো না। একদিনে তো আর পূজা করে পরিস্থিতি ঠিক হয় না। এই যুক্তিই কোনোভাবে মানতে পারছি না আমি। এমন খারাপ, কঠিন পরিস্থিতিতে যখন মানুষের মৃত্যুকে, হাহাকারকে বাদ দিয়ে এই সব দিকে নজর দিতে হচ্ছে সত্যিই কিছু বলার নেই। আর উপায় না থেকেও আজ মানুষকে বলতে হচ্ছে হচ্ছে জয় শ্রী রাম ! “

এরপরে বেহালার সায়ন মিত্র, যিনি পেশায় একজন অ্যাডভোকেট, তাঁর সাথে কথা বললে তিনি বলেন, ” এটি একটি দীর্ঘ ৫০০ বছরের ইতিহাসের সমস্যা। এতে মহামান্য শীর্ষ আদালত (সুপ্রিম কোর্ট) তাঁর রায় দিয়ে এই সমস্যার সমাধান দিয়েছেন। আজ ভূমিপূজার মাধ্যমে সেই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে তার অবসান ঘটেছে। মহামান্য আদালতের নির্দেশ আমরা শেষপর্যন্ত কার্যকর করতে পেরেছি। শ্রী রামের জন্মভূমিতে যে রাম মন্দিরের স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম তা আজ বাস্তবায়িত হয়েছে, এর থেকে বড় আনন্দের বিষয় আর কী হতে পারে। সকলের দর্শনের জন্য এই মন্দির। ”

এরপর করোনা পরিস্থিতিতে ভূমিপূজা যথাযথ কী না জিজ্ঞাসা করা হলে বলেন, এই অতিমারীতে নানান গাইডলাইন নিয়েই আজকের পূজার সমস্ত আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে গাফিলতির কোনো প্রশ্নই থাকছে না। সকল গাইডলাইন মেনে, নানান প্রিকশান নিয়েই কিন্তু আজকের ভূমি পূজার অনুষ্ঠানটি হচ্ছে। এছাড়া সুস্থতার হরে দেশ এখন এগিয়ে। তাই বলাই যায় আজকের এই পূজার কারনে অন্তত কেউ করোনা আক্রান্ত হবেন না।

Tags
Show More

Related Articles

Back to top button
Close
Close
%d bloggers like this: