Nation

বের হল বাবরি মসজিদ ধ্বংসের রায়, কিন্তু ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন ?

দেবশ্রী কয়াল : দীর্ঘ ২৮ বছরের মামলার বের হয়ে গেল রায়। বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলায় মূল অভিযুক্ত তত্‍কালীন উপ প্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানি, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুরলি মনোহর যোশী ও উমা ভারতী, উত্তর প্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং হয়ে গেলেন বেকসুর খালাস আদালতের রায়ে। যে নিয়ে সমালোচলা শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। কিন্তু ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন ? কেন ভাঙা হয়েছিল এই বাবরি মসজিদ ?

১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসের ৬ তারিখে ভেঙে ফেলা হয়েছিল এই পরিত্যক্ত বাবরি মসজিদকে। জানা যায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং এর সহযোগী সংগঠনের হিন্দু কর্মীরা উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যাতে ষোড়শ শতাব্দী কালের বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে। ইতিহাস বলে, ষোড়শ শতাব্দীতে মুঘল সেনাপতি মির বাকি একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যা বাবরি মসজিদ নামে পরিচিত। যে স্থানে মসজিদটি নির্মাণ করেন সেটাকে সবাই রামের জন্মভূমি বলেই মানতো, সেটার উপরের অংশ ভেঙ্গে ফেলে এবং মন্দিরের মূলভিত্তির উপরেই মসজিদ তৈরি করে বাবরের সেনাপতি মীর বাকি খাঁ। এই মসজিদ তৈরি করার সময়, যেসব হিন্দুদেরকে বন্দী করে রাখা হয়েছিলো, তাদের গলা কেটে প্রথমে একটি পাত্রে সেই রক্ত সংগ্রহ করা হয় এবং তারপর জলের পরিরর্তে চুন-সুড়কির সাথে সেই রক্ত মিশিয়ে মন্দিরের মূল ভিতের উপরই ইটের পর ইট গেঁথে মসজিদ নির্মান করা হয়। তাই বলা হয় এই মসজিদ কেবল একটা মোঘল সম্রাজ্যের বিজয় স্মারক ন্যায়, ইসলামি প্রথাসম্মত মসজিদ এটা নয়।

এরপর আশির দশকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ তাদের রাজনৈতিক সহযোগী ভারতীয় জনতা পার্টিকে সাথে নিয়ে ঐ স্থানে রাম মন্দির নির্মাণের জন্য প্রচার অভিযান চালায়। মসজিদের পরিবর্তে রাম মন্দির নির্মাণের জন্য কিছু শোভাযাত্রা ও মিছিলও আয়োজন করা হয়েছিল। এই সব শোভাযাত্রা ও মিছিলের মাঝে অন্তর্ভুক্ত ছিল রাম রথ যাত্রা, যার নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন উপ প্রধানমন্ত্রী লাল কৃষ্ণ আদভানি।

এরপরে চলে অনেক মিছিল, শোভাযাত্রা, লড়াই। তারপর ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর ভিএইচপি ও বিজেপি ঐ স্থানে দেড় লাখ করসেবককে নিয়ে একটি শোভাযাত্রা বের করে। কিন্তু সেই শোভাযাত্রা চলাকালীন সময়ে তারা সহিংস হয়ে পড়ে এবং আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সকল বাধা উপেক্ষা করে বাবরি মসজিদটি ভেঙে ফেলে। পরবর্তীকালে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায় যে, ঐদিনের ঘটনাটির সাথে ৬৮ জন জড়িত, যাদের মাঝে কিছু বিজেপি এবং ভিএইচপির নেতারও নাম জড়িত রয়েছে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দরুন ভারতের হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মাঝে সৃষ্টি হয় বহু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, যা বেশ কয়েকমাস ধরে তাদের মাঝে চলেছিল।

ওই দিনই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলো ঐ বিতর্কিত স্থানে এক শোভাযাত্রার আয়োজন করে। শোভাযাত্রায় শামিল হয়েছিল দেড় লাখ ভিএইচপি এবং বিজেপি “কর সেবক”। এছাড়া, ওই অনুষ্ঠানে আদভানি, মুরলি মনোহর জোশি ও উমা ভারতীর মত বিজেপি নেতা ভাষণ দিয়েছিলেন। শোভাযাত্রা চলাকালীন সময়ের প্রথম দিকে জন সাধারণ ক্লান্তিহীনভাবে স্লোগান দিচ্ছিল। যাতে এই শোভাযাত্রায় কোনো বিশৃঙ্খলতা সৃষ্টি না হয় সেই জন্যে সহিংসতা প্রতিরোধে স্থাপনাটির চারদিকে পুলিশি বেষ্টনীও তৈরি করা হয়েছিল।

কিন্তু দুপুরের দিকে এক যুবক হটাৎ বেষ্টনী অতিক্রম করে স্থাপনাটির উপরে চলে যায় এবং গেরুয়া পতাকা উত্তোলন করে। এই ঘটনাই ছিল সহিংসতার আগমন বার্তা। আর ঠিক তারপরেই, উন্মত্ত জনতার সামনে পুলিশি বেষ্টনীও হার মেনে যায়। এরপর, উন্মত্ত জনতা কুঠার, হাতুড়ি এবং গাইতি দিয়ে ইমারতটি ভাঙা শুরু করে। কয়েক ঘণ্টার মাঝে কাদা ও চুনাপাথর দ্বারা নির্মিত ইমারতটি মাটির সাথে মিশে যায়।

এরপর ২০০৯ সালে মনমোহন সিং লিবারহানের লিবারহান কমিশনের প্রতিবেদনে এই ঘটনার সাথে ৬৮ জন জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়, যাদের অধিকাংশই ছিলেন বিজেপি নেতা। দোষী ব্যক্তিদের নামের তালিকায় ছিলেন বাজপেয়ী, আদভানি, জোশি এবং বিজয় রাজে স্কিন্দিয়ার নাম ছিল। উত্তর প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংয়ের সমালোচনা করা হয় প্রতিবেদনটিতে। ছিলেন উমা ভারতীও।

ওই প্রতিবেদনটিতে অযোধ্যার পুলিশ ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয় ভূমিকার কথাও উল্লেখ করে হয়েছে। সেদিন আদভানি ও মুরলি মোহন জোশির বক্তব্য জনতাকে আরো বেশি করে উন্মত্ত করে তুলেছিল। ওই প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয় যে কিছু বিজেপি নেতা, সেদিন মসজিদ ভাঙার সময়ে “কর সেবকদের থামতে দুর্বল অনুরোধ করেছিলেন… হয়ত মন থেকে অথবা গণমাধ্যমে সহানুভূতি পাবার জন্য।” কর সেবকদের পবিত্র গৃহে প্রবেশ করা কিংবা ইমারতটি ধ্বংস করা থেকে বিরত করার জন্য কেউ কোন অনুরোধ করে নি। বরং বলা যেতে পারে পরোক্ষভাবে তাঁদের উস্কানি দিয়েছিল সেই কাজে। জানা যায় সেই সময় মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে সহজেই থামানো যেত, কিন্তু উপস্থিত নেতারা কেউই তা চায়নি আর তার থেকেই বোঝা যায় মসজিদ ভাঙা তাদের সুপ্ত ইচ্ছা ছিল।

এদিকে ২০০৫ সালের মার্ভে একটি বইয়ে সাবেক গোয়েন্দা প্রধান মলয় কৃষ্ণ ধর দাবি করেন যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস), বিজেপি এবং ভিএইচপির নেতারাই এই ইমারতটি ভাঙার দশ মাস পূর্বেই এটি ভাঙার পরিকল্পনা করেছিলেন। ওই বইটিতে ইস্যুটির ব্যাপারে পি. ভি. নরসিমা রাওয়ের পদক্ষেপের সমালোচনা করা হয়। এরপর মলয় কৃষ্ণ ধর আরো দাবি করেন যে, তিনি বিজেপি ও সংঘ পরিবারের ব্যক্তিদের একটি বৈঠকের নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্বে ছিলেন এবং বৈঠকটিতে নিঃসন্দেহে “তারা পূর্ব পরিকল্পনা করেই এই কাজটি সম্পন্ন করতে চেয়েছিলেন।” তিনি উল্লেখ করেন যে, তিনি ঐ বৈঠকের কথাবার্তা রেকর্ড করে তার উপরের কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, তিনি নিশ্চিত যে ব্যাপারটা তার উপরের কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রী (রাও) এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে (শঙ্কররাও চবন) অবহত করেছেন। এরপরে তিনি আরো দাবি করেন যে, এ বিষয়ে কেউ প্রকাশ্যে স্বীকার করুক আর নাই করুক, মনে মনে সবাই স্বীকার করবেই অযোধ্যার ঘটনা ” হিন্দুত্বকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে অনন্য সুযোগ হিসেবে কাজ করেছে। ভেঙে ফেলেছিল বাবরি মসজিদ।

এরপর ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে কোবরাপোস্ট এর একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, বাবরি মসজিদ ধ্বংস কার্যের পিছনে কেবল শুধু উন্মত্ত জনতার কাজ ছিল না, এটা ছিল একটি পূর্ব পরিকল্পিত, অতি গোপনীয়তার সাথে এই পরিকল্পনা কার্য করা হয়েছিল। যাতে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা এটি সম্পর্কে কোন কথা জানতে না পারে। প্রতিবেদটিতে আরো দাবি করা হয় যে, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং শিব সেনার সদস্যরা আলাদা আলাদা ভাবে ইমারতটি ধ্বংসের কয়েক মাস পূর্বেই ইমারতটি ধ্বংসের পরিকল্পনা করেছিল। অর্থাৎ এই ঘটনা শোভাযাত্রা তে বেরিয়ে হটাৎ করে ঘটে যায়নি, সম্পূর্ণ পূর্ব পরিকল্পনা করেই সম্পূর্ণ ঘটনাটি ঘটানো হয়েছিল।

১৯৯২ সালে ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ১০ মাস পর চার্জশিট দেয় সিবিআই। অভিযোগের তালিকায় প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে নাম ছিল, লালকৃষ্ণ আদ বাণী, মুরলী মনোহর জোশী, উমা ভারতী, কল্যাণ সিং, বিনয় কাটিয়ার, সাক্ষী মহারাজ, সাধ্বী ঋতম্ভরা, নৃত্য গোপাল দাস, চম্পত রাইয়ের, অশোক সিঙ্ঘল, গিরিরাজ কিশোর, বিষ্ণুহরি ডালমিয়া, শিবসেনা সুপ্রিমো, বাল ঠাকরে আরও অনেকেই। প্রথমে আদালতে আদালতে ৪৯ জন অভিযুক্ত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ১৭ জনের ইতিমধ্যেই মৃত্যু হয়েছে।

এই ঘটনার পর সাবেক ফৈজাবাদ জেলায় পুলিস ২টি এফআইআর দায়ের করে। ১৯৭ নম্বর এফআইআরে অজ্ঞাতপরিচয় লাখো করসেবকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়। লখনউয়ের আদালতে শুরু হয় মামলা। ১৯৮ নম্বর এফআইআরে আডবাণী, জোশী, উমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করা হয়। রায়বরেলির আদালতে শুরু হয় মামলা। তদন্ত শুরুর পর তিরানব্বইয়ের অক্টোবরে ২ মামলায় যৌথ চার্জশিট দেয় সিবিআই। ৪৮জন নেতার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাও মসজিদ ধ্বংসে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনে। ২০০১-এ আডবাণী-সহ ১৪ জন নেতাকে, ষড়যন্ত্র, দাঙ্গা, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা তৈরি করা ও বেআইনী জমায়েত এর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়। আর আজ এই ঐতিহাসিক মামলার রায় দেন করা হয়। এবং আজ সিবিআই বিচারক সুরেন্দ্র কুমার যাদব, ঘটনায় অভিযুক্ত আদবানি, যোশী, উমা ভারতী সহ ৩২ অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস করে দেন, এবং জানান এই ঘটনা পূর্ব পরিকল্পিত নয়।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
%d bloggers like this: