Culture

চলে গেলেন তবে রয়ে যাবে – স্মৃতির সরণি বেয়ে ১৯৪৪- ২০২১ : ” চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত “

চলচিত্র ,সংস্কৃতি. বাংলা সাহিত্য জগতে ইন্দ্রপতন : শ্রদ্ধা-নিবেদন সৌমিতা মুভিজ এর পক্ষে

সুবীর ঘোষ, চলচিত্র নির্মাতা : বাংলার ইন্দ্রপতন আরেকবার , ভারতীয় কবি এবং বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত চলে গেলেন তবে রয়ে যাবে অনন্য সৃষ্টি।ভীষণ অল্প কথার মানুষ ছিলেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। একমাত্র কাজ নিয়ে নায়িকা, অভিনেতাদের সঙ্গে তিনি কথা বলতেন। বাকি সময় নিজের মতো চুপচাপ থাকতেন। বিভিন্ন বিষয়ে জানার চরম ইচ্ছে ছিল , শুধু বিষয়টিকে জানা বোঝার জন্য মাঝেমধ্যে বেরিয়ে পড়তেন। লোকমুখের কথাটা বিশ্বাস করলেও নিজের চোখে একবার দেখা দরকার এই ভাবেই চলচিত্র থেকে সাহিত্যের দুনিয়াতে বিচরণ করতেন। অনেক পরিচালকেরা , অভিনেতা -অভিনেত্রী ও কলাকুশলীদের সাথে শুটিংয়ের পর আড্ডা দেন , কিন্তু বুদ্ধদেব সেভাবে ধরা দিতেন না , কিন্তু কাজের বিষয়ে অপার দায়িত্ববোধ ছিল।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত ছিলেন একজন ভারতীয় কবি এবং বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা। রাজনীতির কচকচানি বাইরে থাকলেও তার সৃষ্টিতে বার বার উঠে এসেছে বর্তমান সমস্যার বিভিন্ন দিক। তার নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোতেও কবিতার ছোঁয়া বিদ্যমান ছিল।তার বিখ্যাত কয়েকটি ছবি হল বাঘ বাহাদুর, তাহাদের কথা,চারাচার ও উত্তরা। শ্রেষ্ঠ পাঁচটি চলচ্চিত্র বাঘ বাহাদুর (১৯৮৯)চারাচার (১৯৯৩), লাল দরজা (১৯৯৭), মন্দ মেয়ের উপাখ্যান (২০০২) , কালপুরুষ (২০০৮), দৌরাতওয়া (১৯৭৮)এর জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, এবং তাহাদের কথা (১৯৯৩) বাংলাতে শ্রেষ্ঠ ফিচার ফিল্মের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন। পরিচালক হিসেবে তিনি উত্তরা (২০০০) এবং স্বপনের দিন (২০০৫) এর জন্য দুইবার সেরা নির্দেশনার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন। বছরের পর বছর ধরে তিনি গভীর আরালে, কফিন কিম্বা সুটকেস, হিমজগ, ছাতা কাহিনি, রোবটের গান, শ্রেষ্ঠ কবিতা, ভোম্বোলের আশ্চর্য কাহিনি ও অন্যান্য কবিতা সহ কবিতার বিভিন্ন রচনা প্রকাশ করেছেন। শুধু তাই নয় লেখা লিখির জগতেও ছিল অপার চলাচল।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত ১৯৪৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ পুরুলিয়ার নিকটবর্তী আনারাতে একটি বৈদিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, এবং নয় জন ভাইবোন ছিলেন। তার বাবা তারকান্ত দাশগুপ্ত ভারতীয় রেলওয়ের একজন ডাক্তার ছিলেন, এইভাবে তিনি শৈশবের প্রথম অংশ অতিবাহিত করেছিলেন। বারো বছর বয়সে তিনি হাওড়া দিনাবন্ধু স্কুলে পড়াশোনা করার জন্য কলকাতায় যান। স্বাধীনতার পর তার পিতা প্রথমে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার খড়গপুর এবং মানেন্দ্রগড় (এখন ছত্তিশগড়ে) বদলি হন ।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত স্কটিশ চার্চ কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনা করেন , কর্মজীবনে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্যামসুন্দর কলেজে এবং কলকাতার সিটি কলেজে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৬ সালে তিনি অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন, যা তাকে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য উৎসাহিত করেছিল। এর পর কলকাতা ফিল্ম সোসাইটির সঙ্গে সম্পর্ক হয় , যেখানে তিনি প্রথম তার কাকার সাথে সিনিয়র হাই স্কুলে থাকা অবস্থা‌য় যেতেন ,তাকে চার্লি চ্যাপলিন, ইঙ্গমার বার্গম্যান, আকিরা কুরোসাওয়া, ভিত্তরিও দে সিকা, রবার্টো রোসেলিনি এবং মাইকেল এনজেলো আন্তোনিওনির মত পরিচালকের কাজের সাথে পরিচয় করিয়েছিল। এর ফলে শুরু থেকেই তার কাজের ঘরানায় পাশ্চাত্যের প্রভাব থাকলেও সরাসরি প্রকাশ পায় নি। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত ১৯৬৮ সালে ১০ মিনিটের একটি ডকুমেন্টারি দ্য় কন্তিনেন্ত অব লাভ দিয়ে চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন, অবশেষে তিনি ১৯৭৮ সালে তার প্রথম সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ফিচার ফিল্ম, দোরাতওয়া (দূরত্ব) তৈরি করেছিলেন।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এর চলচ্চিত্রের কর্মজীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে, সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রগুলির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন পাশাপাশি বিশ্ব চলচ্চিত্রের সাথেও ছিল তার অপার সহাবস্থান।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এর ফিচার ফিল্ম : সময়ের কাছে (১৯৬৮) (short), দুরত্ব (১৯৭৮) (Distance) , নিম অন্নপূর্ণা (১৯৭৯) (Bitter Morsel), গৃহযুদ্ধ (১৯৮২) (The Civil War), অন্ধ গলি (১৯৮৪) (Blind Alley), ফেরা (১৯৮৮) (The Return), বাঘ বাহাদুর (১৯৮৯) (The Tiger Man) ,তাহাদের কথা (১৯৯২) (Their Story), চরাচর (১৯৯৩) (Shelter of the Wings) , লাল দরজা (১৯৯৭) (The Red Door ), উত্তরা (২০০০) (The Wrestlers), মন্দ মেয়ের, উপাখ্যান (২০০২) (A Tale of a Naughty Girl), স্বপ্নের দিন (২০০৪) (Chased by Dreams), আমি, ইয়াসিন আর আমার মধুবালা (২০০৭) (The Voyeurs), কালপুরুষ (২০০৮) (Memories in the Mist), জানালা (২০০৯) (The Window) , মুক্তি(২০১২), পত্রলেখা (২০১২), আনোয়ার কা আজিব কিসসা (২০১৩) (Sniffer, Hindi) , টোপ (২০১৭)

এর পাশাপাশি বুদ্ধদেব দাসগুপ্তের তথ্যচিত্র ও টিভিকর্মের ভান্ডার টিও কম নয় : দ্য় কন্তিনেন্ত অব লাভ (১৯৬৮), ধোলার রাজা খিরোড নত্ত (১৯৭৩) , ফিশারম্যান অব সুন্দরবন (১৯৭৪), সারাচন্দ্র (১৯৭৫) ,রিদম অব ষ্টিল(১৯৮১) ,ইন্ডিয়ান সায়েন্স মার্চে অ্যাহেড (১৯৮৪), বিজ্ঞান ও তার আবিষ্কার (১৯৮০), গ্লাস স্টোরি (১৯৮৫), ভারত অন দ্য মুভ (১৯৮৫), সিরামিকস (১৯৮৬), আরণ্যক (১৯৯৬), কন টেম্পোরারি ইন্ডিয়ান স্ক্‌লাপচার (১৯৮৭) , হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান জুট(১৯৯০)

বুদ্ধদেব দাসগুপ্তের পুরস্কার ও সম্মাননা ঝুলি এক নজরে :
১)২০০৮ সালের ২৭ মে স্পেনের মাদ্রিদ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে জীবনকালের কৃতিত্বের সম্মাননা প্রদান করা হয়।
২) ২০০৭ সালে এথেন্স আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন এথেনা পুরস্কার
৩) জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার

সেরা চলচ্চিত্র এর মধ্যে : ১৯৮৯: বাঘ বাহাদুর, ১৯৯৩: চারাচার, ১৯৯৭: লাল দরজা, ২০০২: মন্দ মেয়ের উপাখ্যান
২০০৮: কালপুরুষ, সেরা নির্দেশনা, ২০০০: উত্তরা, ২০০৫: স্ব‌প্‌নের দিন

সেরা চিত্রনাট্য এর মধ্যে : ১৯৮৭: ফেরা,

বাংলাতে সেরা ফিচার ফিল্ম এর মধ্যে : ১৯৭৮: দোরাতওয়া, ১৯৮৭: ফেরা, ১৯৯৩: তাহের কথা

শ্রেষ্ঠ আর্টস / সাংস্কৃতিক ফিল্ম এর মধ্যে : ১৯৯৮: এল পেইন্টার অফ ইলোকেন্ট সাইলেন্স: গণেশ পাইন,

ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভাল এ অংশগ্রহন :

১৯৮২: এফআইপিআরএসসিআই পুরস্কার: গৃহযুদ্ধ
২০০০: শ্রেষ্ঠ পরিচালক জন্য সিলভার লায়ন: উত্তরা
১৯৮২: গোল্ডেন লায়ন মনোনয়ন: গৃহযুদ্ধ
২০০০: গোল্ডেন লায়ন মনোনয়ন: উত্তরা

বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এ অংশগ্রহন :

১৯৮৮: গোল্ডেন বিয়ার মনোনয়ন: ফেরা
১৯৯৪: গোল্ডেন বিয়ার মনোনয়ন: চারাচার

লোকার্নো ফিল্ম ফেস্টিভাল এ অংশগ্রহন :

সমালোচকদের পুরস্কার: দোরাতওয়া
বিশেষ জুরি পুরস্কার: নিম অন্নপূর্ণা

এশিয়া প্যাসিফিক চলচ্চিত্র উৎসব এ অংশগ্রহন :
সেরা চলচ্চিত্র: জানালা

কার্লোভি ভারি ফিল্ম ফেস্টিভাল এ অংশগ্রহন :
বিশেষ জুরি পুরস্কার: নিম অন্নপূর্ণা

দামাস্কাস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এ অংশগ্রহন :
গোল্ডেন প্রাইজ: নিম অন্নপূর্ণা

ব্যাংকক আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভাল এ অংশগ্রহন :
সেরা এশিয়ান ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড (২০০৩): মন্দ মেয়ের উপাখ্যান

দীর্ঘদিন ধরে কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। তাঁর ডায়ালিসিস চলছিল। আজও ডায়ালিসিস হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভোরবেলা তাঁর স্ত্রী সোহিনী দাশগুপ্ত দেখেন, বুদ্ধদেব বাবুর শরীর ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। শরীরে আর প্রাণ নেই। ঘুমের মধ্যেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরিবার সূত্রে খবর, তাঁর দুই মেয়েই মুম্বইয়ে থাকেন। করোনাবিধির কারণে তাঁরা আসতে পারছেন না। আজ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর শেষকৃত্য় সম্পন্ন হবে। বুদ্ধদেব বাবুর তার বড় কন্যা, অলকানন্দ দাশগুপ্ত, একজন প্রশিক্ষিত শাস্ত্রীয় পিয়ানোবাদক তারই কাছে রয়েগেল অপার সম্ভার, স্মৃতির সরণি বেয়ে অমৃতলোকে যাত্রা করলেন বাংলার কৃতি মানুষ। দেশের রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যের রাজ্যপাল , দেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের পক্ষেও শোকপ্রকাশ করেন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
%d bloggers like this: