Health

সম্প্রতি করোনা প্রকোপে নতুন চর্চা , ব্ল্যাক ফাঙ্গাস। দুয়ারে বিপদ আর তাই নিয়ে ভয় জন্ম নিচ্ছে। ওপিনিয়ন টাইমস এর মুখোমুখি ড: সৌগত বসু।

বর্তমানে করোনা প্রকোপে সংশয় আর ভয় , তারই মধ্যে অজানাকে জানার খোঁজে একটি প্রয়াস। চলবে এই প্রচেষ্টা

মিউকরমাইকোসিস কি ?

মিউকরমাইকোসিস (Mucormycosis) যার পূর্বের নাম জাইগোমাইকোসিস (Zygomycosis) একটি বিরল এবং ভয়ানক ছত্রাক ঘটিত রোগ। মিউকোরেলস বর্গের(Order – Mucorales) মিউকোরেসি ফ্যামিলির (Family – Mucoraceae) এই সূত্রাকার ছত্রাকের দ্বারাই মানবদেহে মিউকরমাইকোসিস রোগ সৃষ্টি হয়, যাকে কোভিড – ১৯ সংক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকসময় কালো ছত্রাক তথা Black Fungus Disease নামে অভিহিত করা হয়েছে।

এই ছত্রাক কোখায় থাকে ?

প্রায় সর্বত্র বিদ্যমান এই ছত্রাক পরিবেশের বিভিন্ন অংশে থাকে।
মাটিতে পচে যাওয়া বিভিন্ন জৈব পদার্থ যেমন গাছের পাতা, ফসলের অবশিষ্টাংশ, বিভিন্ন পচা ফল বা ফলের অবশিষ্টাংশ, বাড়ির রান্নার পর ফেলে দেওয়া আনাজপত্রের খোসা, মাটিতে ফেলে দেওয়া পাঁউরুটি, পচা কাঠ ইত্যাদির মধ্যে প্রচুর পরিমাণে থাকে।
এর পাশাপাশি দুটি ফসল চাষের মধ্যবর্তী সময় মাটিতে পড়ে থাকা বিভিন্ন অংশে, পশুপাখির মল ইত্যাদির মধ্যেও এই ছত্রাকের রেণু থাকে।

নির্মীয়মাণ বাড়ির জমে থাকা জল ও বাতাসে, যে কোন বাড়ির ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে দেওয়াল এবং তার চারপাশের বায়ুমণ্ডলীয় অংশের মধ্যে, দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে এরকম কোন বাড়ির আর্দ্র, স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে এই ছত্রাকের কলোনি দেখতে পাওয়া যায়।
কোভিড -১৯ সংক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যাচ্ছে যে বিভিন্ন হাসপাতাল যেখানে রোগীর চিকিৎসা হচ্ছে, অনেক চিকিৎসা-বর্জ্য জমা হয়েছে, একটু ভিজে, স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ রয়েছে এবং আমাদের বর্তমান উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশের কারণে প্রচুর ছত্রাকের রেণু সেই সব হাসপাতালের বায়ুতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

কোন কোন ছত্রাক এই মিউকরমাইকোসিস রোগ সৃষ্টি করে ?

মিউকোরেলস বর্গের (Order – Mucorales) মিউকোরেসি ফ্যামিলির (Family – Mucoraceae) অন্তর্গত অনেকগুলি ছত্রাকের রেণু থেকে মিউকরমাইকোসিস রোগ হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :
Rhizopus species (viz. Rhizopus arrhizus, Rhizopus microsporus, Rhizopus homothallicus),
Mucor species (viz. Mucor irregularis),
Rhizomucor species,
Syncephalastrum species,
Cunninghamella bertholletiae,
Apophysomyces species (viz. Apophysomyces variabilis),
Lichtheimia (formerly Absidia) species,
Saksenaea erythrospora,
Thamnostylum lucknowense.

মিউকরমাইকোসিসের বিভিন্ন প্রকারভেদ :

রাইনোসেরিব্রাল মিউকরমাইকোসিস : নাক ও সাইনাস অঞ্চলের মাধ্যমে এই সংক্রমণ ঘটে। ধীরে ধীরে সেই সংক্রমণ মস্তিষ্ক এবং চোখে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত রোগীর দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস অথবা কিডনি প্রতিস্থাপন হয়েছে এমন রোগীদের ক্ষেত্রে এই রোগ বেশি হয়।
রাইনোসেরিব্রাল মিউকরমাইকোসিস রোগের লক্ষণ :
• নাকের চামড়ার উপর কালো রঙের স্পট/ছোপ,
• নাকের ব্যবধায়ক পর্দায় এবং মুখের উপর তালুতে কালো কালো স্পট,
• নাক থেকে কালো রঙের তরল নিঃসরণ,
• নাকের উপর এবং আশপাশের চামড়ায় রক্তজমাট বাঁধা জনিত ক্ষত,
• নাসিকা গহ্বরে ক্ষত,
• বন্ধ নাক (দীর্ঘ সময়),
• মুখের একপাশে ব্যথা, ফোলা,
• দীর্ঘসময় ধরে প্রবল জ্বর, কখনো কখনো খিঁচুনি দেখা যায়,
• মাথার যন্ত্রণা, মাথা ব্যথা,
• নাক এবং সাইনাসে সর্দি জমা, সাইনাসে ক্ষত,
• আবছা দৃষ্টি, চোখ ফোলা, চোখের মুভমেন্ট কম দেখতে পাওয়া যায়।

সাধারণত 30 থেকে 70 শতাংশ ক্ষেত্রে রোগীর তারতম্য অনুযায়ী এই রোগটি প্রাণঘাতী হতে পারে।
পালমোনারি মিউকরমাইকোসিস : এই সংক্রমণ সরাসরি ফুসফুসের মধ্যে ঘটে। ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি যার কেমোথেরাপি চলছে অথবা অঙ্গ প্রতিস্থাপন হয়েছে বা স্টেম সেল প্রতিস্থাপিত হয়েছে এমন রোগীদের ক্ষেত্রে এই ধরণের রোগ বেশি দেখা যায়।

পালমোনারি মিউকরমাইকোসিস রোগের লক্ষণ :

• জ্বর,
• বুকে ব্যথা,
• শ্বাসকষ্ট,
• সর্দি,
• শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন অংশে রক্তক্ষরণ,
• ফুসফুসের পাশে জল জমা – এই রোগে দেখতে পাওয়া যায়।
গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল মিউকরমাইকোসিস : এই রোগটি সাধারণত বয়স্কদের তুলনায় শিশুদের বেশি দেখা যায়। বিশেষত কম ওজনের শিশু – যারা সময়ের আগে জন্মেছে এবং যাদের এক মাসের কম বয়স, অথবা যারা অ্যান্টিবায়োটিকের চিকিৎসায় রয়েছে, কোন সার্জারি হয়েছে বা নির্দিষ্ট সময় ধরে ওষুধ খেতে হচ্ছে, শরীর দুর্বল এমন শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগ দেখা যায়।

গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল মিউকরমাইকোসিস রোগের লক্ষণ :

• পেটে ব্যথা,
• বমি বমি ভাব,
• বমি বমি ভাব,
• বমি হওয়া,
• পেট ফুলে যাওয়া,
গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল অংশে রক্তপাত ঘটা – এই রোগের অন্যতম প্রধান লক্ষণ।
কিউটেনিয়াস মিউকরমাইকোসিস : দুর্ঘটনা থেকে সেরে ওঠার কোন ব্যক্তির বা দেহের ত্বকে ক্ষত রয়েছে এমন ব্যক্তির অথবা আগুনে পুড়ে গেছেন এমন ব্যক্তি মাটির তথা ছত্রাকের রেণুর সংস্পর্শে এলে এই রোগ ঘটে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নিয়মাবলী ঠিক মতো অনুসরণ করলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগ দ্রুত সেরে ওঠার সম্ভাবনা থাকে।

কিউটেনিয়াস মিউকরমাইকোসিস রোগের লক্ষণ :


• এই রোগটি আলসারের ন্যয় ক্ষত তৈরি করে,
• দেহের চামড়ার কালো কালো দাগ দেখা যায়,
• যন্ত্রণা, জ্বর,
• ক্ষতের চারপাশ ফুলে যাওয়া, প্রচন্ড গাঢ়, লাল লাল দাগ দেখা যায়।
ডিসেমিনেটেড মিউকরমাইকোসিস : সবচেয়ে ভয়ংকর এই মিউকরমাইকোসিস রোগে ছত্রাকের দেহ নিঃসৃত বিভিন্ন টক্সিন সরাসরি রক্তে মিশে যায় এবং রক্তের মাধ্যমে দেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গে টক্সিন পৌঁছে ফুসফুস, মস্তিষ্ক, হৃদপিন্ড, ত্বক সবকিছুরই প্রবল ক্ষতি হয়। প্রায় 90 শতাংশ ক্ষেত্রে এই রোগটি প্রাণঘাতী। এইচআইভি রোগীর ক্ষেত্রে এই রোগ হলে মৃত্যু অবধারিত।

ডিসেমিনেটেড মিউকরমাইকোসিস রোগের লক্ষণ :

• মস্তিষ্কের এই সংক্রমণ রোগীর মানসিক বৈকল্য ঘটাতে পারে,
• আবার মস্তিষ্কের সংক্রমণ অনেক ক্ষেত্রেই রোগীকে কোমার দিকে ঠেলে দেয়।
• মিউকরমাইকোসিসের পূর্বনির্ধারিত কারণসমূহ (Predisposing factors of Mucormycosis) :
• হাইপারগ্লাইসেমিয়া (চিহ্নিত হয় নি অথবা অনিন্ত্রিত),
• কিটোআসিডোসিস,
• কোভিড রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহৃত কর্টিকোস্টেরয়েড এবং সাইটোকাইন স্টর্ম প্রতিরোধক কৌশল জনিত কারণ,
• ক্যানসার,
• অঙ্গ প্রতিস্থাপন,
• নিউট্রোপিনিয়া (রক্তের নিউট্রোফিল সংখ্যার হ্ৰাস),
• কেমোথেরাপি,
ভোরিকোনাজোল থেরাপি (ছত্রাক ঘটিত রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত)।

কাদের ক্ষেত্রে মিউকরমাইকোসিস চিন্তার কারণ ?

• ডায়াবেটিস সহ কোভিড -১৯ সংক্রমণ
• অতিমাত্রার ষ্টেরয়েড ব্যবহার
• দীর্ঘসময় ধরে ষ্টেরয়েড ব্যবহার
• অতিসঙ্কটাপন্ন রোগী যারা দীর্ঘদিন ধরে আইসিইউ তে রয়েছেন

মিউকরমাইকোসিস চিহ্নিত করার উপায় কি ?

  1. আদর্শ পদ্ধতি হল কলা কোষের পচন তথা নেক্রোসিস যার ফলে নাকের এবং মুখের গ্বহরে কালো রঙের পদার্থ নিঃসরণ, জ্বর (অনেক সময় জ্বর থাকে না), রক্তনালিতে সংক্রমণ, থ্রম্বোসিস।
  2. মিউকরমাইকোসিসের একটি বিশেষ প্রবণতাই হল দেহের যে কোন রক্তনালীর মধ্যে প্রবেশ করে প্রথমে থ্রম্বোসিস এবং পরে সংশ্লিষ্ট কলাকৌশল কলা কোষের পচন তথা নেক্রসিস ঘটানো।
  3. আমাদের মত উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশের দেশে মিউকর মাইক্রোসফট সহ বিভিন্ন ছত্রাকের সংক্রমণের ঘটনা অন্যান্য শীতপ্রধান দেশের তুলনায় অনেক বেশি।
  4. অন্য যে কোন ছত্রাকের তুলনায় মানবদেহে বিশেষত যাদের দেহে অন্যান্য রিস্ক ফ্যাক্টরস গুলি বেশি মাত্রায় বিদ্যমান মিউকরমাইকোসিস সংক্রমণ হার বেশি।

রিস্ক ফাক্টরস :

দীর্ঘ সময় ধরে নিউট্রোফিলের সংখ্যার অবনতি (নিউট্রোপিনিয়া),
দীর্ঘ সময় ধরে কর্টিকোস্টেরয়েডের ব্যবহার,
হেমাটলজিক্যাল ম্যালিগনেন্সি (যেমন : লিউকিমিয়া, লিম্ফোমা, মাইলেমা),
অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া,
অঙ্গ প্রতিস্থাপন অথবা স্টেম সেল প্রতিস্থাপন,
এইচআইভি সংক্রমণ,
ডায়াবেটিস,
ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস,
রক্তে আয়রনের অপর্যাপ্ত মাত্রায় উপস্থিতি,
ডায়ালিসিস চলছে এমন রোগী,
পোড়া, ক্ষতস্থান,
অপুষ্টি,
সময়ের আগে জন্মানো শিশু এবং
ড্রাগ আসক্ত ব্যক্তি।

বিশেষ উল্লেখ্য বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন – ভূমিকম্প, সুনামির মতো ঘটনায় (Ref. 2004 সুনামি পরবর্তী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ঘটনা) বিভিন্ন ট্রমা জনিত ক্ষতস্থানে কিউটেনিয়াস মিয়োসিস এর প্রাদুর্ভাব বেশি মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়েছিল।

মেডিকেল ট্রিটমেন্ট :

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের পক্ষ থেকে যে নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়েছে তা নিম্নরূপ :

  1. Amphotericin B deoxycholate (D-AmB) : 1.0-1.5 mg/kg/day
  2. Liposomal amphotericin B (L-AmB) (Preferred Treatment) : 5-10 mg/kg/day
  3. Injection Amphotericin B Lipid Complex : 5 mg/kg/day
  4. Adequate hydration
  5. Monitor renal function and serum potassium

এছাড়া মিউকরমাইকোসিসের চিকিৎসায় অনেক ক্ষেত্রে হেমাটলজিক্যাল ম্যালিগনেন্সি রয়েছে এমন রোগীর ক্ষেত্রে সার্জারি এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল থেরাপি একত্রে প্রয়োগ করে সাফল্য পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে Amphotericin B ও Posconazole একত্রে প্রয়োগ এবং সার্জারির মাধ্যমে মৃতকোষের অপসারণ ঘটিয়ে চিকিৎসা করা হয়।
বিশেষ উল্লেখ্য

কোভিড -১৯ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষত সাইটোকাইন স্টর্ম প্রতিরোধের জন্য অনেক ক্ষেত্রে বেশি মাত্রায় কর্টিকোস্টেরয়েডের ব্যবহার করার ফলে দেহের প্রতিরক্ষা তন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ছে। কোভিড -১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হলেও তার পরবর্তী সময়ে মিউকরমাইকোসিস তথা Black Fungus Disease প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
%d bloggers like this: