West Bengal

মুর্শিবাদে বাম আন্দোলনের ইন্দ্রপতন… চিরনিদ্রায় টগর দি

প্রচারের আড়ালে রয়ে গেল দীর্ঘ ৪০ বছরের আন্দোলন, বাংলার রাজনীতিতে মুর্শিদাবাদ সমসময় অন্যমাত্রা নেয় এর পিছনের অন্যতম কারিগরের নিঃশব্দে প্রয়াণ

দেবশ্রী কয়াল : রাজনৈতিক জগতে সৃষ্টি হয়েছে একটি বড় শূন্যস্থান। অকাল প্রয়াণ ঘটল মহিলা রাজনৈতিক বিদ সিপিআইএম জেলা কমিটির সদস্য টগর দেবী-র। দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক অসুস্থতার কারণেই তাঁর মৃত্যু ঘটে গত ২৬শে সেপ্টেম্বর রাত ১০টা বেজে ৫৫ মিনিটে। তাঁর এইভাবে হটাৎ চলে যাওয়াতে শোকস্তব্ধ সকলেই। তাঁর মৃত্যুতে কেবল সিপিআইএম পার্টির মানুষরা নন, অন্যান্য পার্টির মানুষরাও তাঁর বাড়িতে এসেছিলেন শেষকৃত্যের আগে তাঁকে মাল্যদান করতে, শেষবারের মতো দেখতে। তাঁর সকল পাড়া প্রতিবেশীও ভেঙে পড়েন। এমনকি তাঁর মৃতদেহ বাড়িতে আসার আগে স্থানীয় মসজিদে করানো হয়েছিল তাঁর নাম ঘোষনা। সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রত্যেকটি মানুষের খুব কাছের জন ছিলেন টগর দেবী। তাই তাঁর এমন অকাল প্রয়ানে রাজনৈতিক জগৎ ও তাঁর ব্যক্তি জগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে জানতে গেলে তাঁর স্বামী তথা আর এক রাজনীতিবিদ তুষার দে জানান তাঁদের আলাপ পর্ব থেকে। ১৯৭২ সালের কৃষক সভা রাজ্য সম্মেলন এ নিজের গ্রাম হেরামপুর থেকে মিছিল নিয়ে এসেছিলেন টগর দেবী, সেই সভা সফল করা ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। সেখানেই হয় তাঁদের প্রথম দেখা। সেখানেই টগর দেবীর মধ্যে রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিমূর্তি দেখতে পান তুষার বাবু। এরপর ১৯৭৪ সালে আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন টগর দেবী। তখন সেখানে পুলিশ তাঁকে বেধড়ক মারে, তাঁকে হাসপাতালে পর্যন্ত ভর্তি হতে হয়। কিন্তু তাঁর পরেও একবারের জন্যে মানসিকতার দিক থেকে ভেঙে পড়েননি তিনি।

এই আইন অমান্য আন্দোলনের সময় খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন টগর দেবী। একদম প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে চালিয়ে যাচ্ছিলেন লড়াই। এই সময় সিপিআইএম জয়েন করেন এবং হয়ে যান রাজ্য জেলা কমিটির সদস্য। কখনও অন্যায়-অত্যাচারের সামনে মাথা নত করেননি তিনি, সর্বদা করে গেছেন লড়াই। এছাড়াও তিনি ছিলেন মহিলা শ্রমিক সমিতির জেলা কমিটির সদস্য ছিলেন। নিজের কর্ম জগতে পা দেওয়ার পর সেই অফিসের ইউনিয়নের সাথে তাঁদের সকল দাবি নিয়েও লড়েছেন টগর দেবী। এরপরেই সিআইটিইউ তে যুক্ত হন, হয়ে যান রাজ্য কমিটির সভাপতি।

তুষার বাবু বলেন, ” টগর দেবী নিজের কর্ম জীবন ও রাজনৈতিক জীবনকে খুব সুন্দর ভাবেই নিষ্ঠার সাথে পালন করে গেছেন আজীবন। কিন্তু রাজনীতির জগতে যতবারই তিনি রাস্তায় নেমেছেন কখনও কংগ্রেস, তৃণমূল বা কখনও পুলিশ তাকে বেপরোয়া ভাবে পিটিয়ে গেছে। একসময় অত্যাচার এমন হয় যে, হাত এর অপারেশন পর্যন্ত করতে হয়। নিজের জীবনকে বহুবার বাজি রেখেছেন টগর দেবী, অনেকবার মৃত্যুর দোর গোড়ায় থেকে তিনি ফিরে এসেছেন, কিন্তু কখনও নিজের জীবনের পরোয়া করেননি। চালিয়ে গেছেন লড়াই, সংগ্রাম। সেই সময় তিনি যেভাবে মেয়েদের পাশে দাঁড়াতেন, তখন সব মেয়েরা তাঁর উপর ভীষণভাবে ভরসা করতেন। নিজের কথা, নিজের শারীরিক অবস্থার কথা কখনোই ভাবতেন না, কিন্তু নিজের সকল দায়িত্ব, কর্তব্য দৃঢ় ভাবে পালন করে গেছেন। নিজের রাজনৈতিক জীবনে তিনি যে এত পদ এর অধিকারী হয়েছিলেন তা সবই তাঁর দীর্ঘ লড়াইয়ের কারনে, ফলপ্রাপ্ত।

টগর দেবীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে জানাতে গিয়ে তুষার বাবু বলেন, সবসময় বটবৃক্ষের ন্যায় হয়েছিলেন তিনি। কখনও কিছুর অভাব কাউকে বুঝতে দেননি। সংসারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বরাবরই। সকল প্রতিবেশীরা কোনো সমস্যা হলে ছুটে আসতেন, আর খুব সাবলীলভাবে সকলের টগর দিদি তাঁদের সমস্যার সমাধান করতেন। পার্টি ছাড়াও যাঁদের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল তাঁরাও খুব আপন ছিল। এছাড়া তাঁর একটা খুব বড় গুন ছিল, খুব সহজেই কাউকে নিজের আপন বানিয়ে নিতে পারতেন। স্বল্প আলাপেই আত্মীয়তা সৃষ্টি করে নিতে পারতেন। একবারও মনে হত না, যে অল্প দিনের আলাপ। অর্থাৎ কর্ম জীবন, রাজনৈতিক জীবন এবং নিজের ব্যক্তিগত জীবনে নিজের সকল দায়িত্ব কর্তব্য নিষ্ঠার সাথে পালন করে গেছেন, কখনও পিছু পা হননি। নিজের গোটা রাজনৈতিক জীবনে কখনও ব্যক্তিগত প্রচারকে প্রাধান্য দেননি টগর দেবী। আত্মপ্রচারে একটু বিশ্বাসী ছিলেন না তিনি, বরং বলা ভাল তিনি তা মোটেও পছন্দ করতেন না।

কিন্তু এই দৃঢ় মানসিকতা সম্পন্ন, লড়াই করা মহিলা ২০১৪ সালে হয়ে পড়েন অসুস্থ। শিকার হন, লিভার সিরোসিস্ট রোগ এর। অর্থাৎ যাকে চলতি ভাষায় বলে ক্রনিক লিভার প্রবলেম। যার চিকিৎসা একমাত্র লিভার ট্রান্সপ্লান্ট। বহু চিকিৎসা করে তিনি চালাচ্ছিলেন লড়াই। এরপর হটাৎ করেই আগস্ট মাসের শেষের দিকে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। তখন ১০ দিন মতো বেশ সুস্থ ছিলেন। কিন্তু হটাৎই তাঁর হিমোগ্লোবিন কমাতে থাকে। ধীরে ধীরে কিডনি ফেল হতে থাকে। এবং গত ২৬শে সেপ্টেম্বর রাত ১০ টা বেজে ৫৫ মিনিটে নিজের জীবনের শেষ লড়াইয়ে হেরে গিয়ে চিরনিদ্রায় চলে যান। আজ তাঁর মৃত্যুতে সকলে গভীরভাবে শোকাহত। টগর দেবীর মৃত্যুতে আমরা ওপিনিয়ন টাইমস গভীর ভাবে শোকাহত ও তাঁর পরিবারকে জানাচ্ছি সমবেদনা।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
%d bloggers like this: